নিজস্ব প্রতিবেদক: ভালোবাসার টানে বাংলাদেশে এসে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করা এক নারী। জন্ম পাকিস্তানে হলেও বৈবাহিক সূত্রে তিনি এখন বাংলাদেশের নাগরিক।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ৮ নং মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করে জয়লাভ করেছেন তিনি। নাম বোসরা পারভীন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন অনেক লোকজন। তার সাথে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছবি পোস্ট ও শেয়ার করছেন অনেকে।
১৯৮৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন বোসরা। পরিবারে তিন বোন আর দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। ২০০২ সালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম কাতিয়ারচর এলাকার যুবক রতন মিয়ার সাথে পাকিস্তানে বিয়ে হয় তার। সেখানে তাদের চার মেয়ে আর এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ২০১০ সালে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন এদেশে। কিশোরগঞ্জে স্বামীর বাড়ির জরাজীর্ণ একটি টিনশেড ঘরে পরিবারের লোকজনের সাথে আনন্দেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দেশে আসার মাত্র দুই বছরের মধ্যে তার স্বামী মারা যান। স্বামী মারা গেলেও সন্তানদেরকে নিয়ে স্বামীর বসতভিটায় থেকে যান তিনি। বাবার বাড়ি থেকে নিয়মিত ফোন করে সেখানে চলে যেতে বললেও যাননি। এরপর ২০১৭ সালে মারিয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভোটার হন তিনি।
বোসরা পারভীন জানান, স্বামী মো. রতন মিয়া ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানে যান। সেখানে গিয়ে ২০০১ সালে বোসরা পারভীনের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক হলে সে সুবাদে তাদের বাসায় যাওয়া আসা করতেন তিনি। এক পর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে তাদের মধ্যে। ২০০২ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের পর তাদের সংসারে চার মেয়ে আর এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ২০১০ সালে স্বামীর সাথে চলে আসেন বাংলাদেশে। এখানে আসার মাত্র দুই বছর পরেই ২০১২ সালে মারা যান স্বামী রতন মিয়া। এরপর পাকিস্তান থেকে তার স্বজনরা বহুবার ফোন করেছেন বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে। অপরদিকে এখানকার পরিবেশ, খাবার–দাবার, ভাষা কোন কিছুর সাথেই নিজেকে মিলাতে পারছিলেন না বলে অনেক কষ্ট হচ্ছিল তার। এগুলো দেখে এক পর্যায়ে তার স্বামীর বাড়ির লোকজনও বলেছিলেন তাকে চলে যেতে। কিন্তু স্বামীর ভিটা ছেড়ে যেতে চাননি তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের দিকে তাকিয়ে স্বামীর বসত বাড়িতেই থেকে যান তিনি। অভাব অনটনের সংসার চালাতে অনেক বেগ পোহাতে হয় বোসরাকে। কাজ করেছেন বিভিন্ন বাসা বাড়িতে। সবশেষ শহরের নতুন জেলখানা মোড়ে একটি চায়ের দোকান দিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করেন তিনি। আস্তে আস্তে সবার সাথে চলতে চলতে এদেশের ভাষাও শিখে ফেলেন তিনি।
বোসরা জানান, ২০১৭ সালে এখানকার ভোটার হন তিনি। নির্বাচনের আগে অনেকেই তাকে প্রার্থী হতে বলেন। সে বিষয়টি শ্বশুরকে জানালে তিনি তাতে সম্মতি দেননি। এক পর্যায়ে স্থানীয় লোকজনের উৎসাহ দেখে রাজি হন তার শ্বশুর। এরপর থেকে ৩ টি ওয়ার্ডের লোকজন নিজেদের টাকায় তহবিল গঠন করে তার নির্বাচনের ব্যয়ভার বহন করেন। বিপুল ভোটে নির্বাচিতও করেন তাকে৷ তিনি বলেন, এ দেশের মানুষ ভিনদেশী একটা মানুষকে এত সহজে আপন করে নিয়ে যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তিনি আজীবন তাদের কাছে ঋণী হয়ে থাকবেন। পাশাপাশি এই এলাকার বাসিন্দারা তার বিপদে আপদে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন তিনিও ঠিক সেইভাবেই তাদের পাশে দাঁড়াতে চান।ি
বোসরা পারভীনের জা (দেবরের স্ত্রী) চায়না আক্তার বলেন, ২০১০ সালে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পাকিস্তানি ভাবি যখন এদেশে আসেন, তখন আমরা ভেবেছিলাম ওনি এখানে থাকবেন না। কিছুদিন পরেই বোধহয় চলে যাবেন। ২০১২ সালে যখন রতন ভাই মারা যান, তখন ভেবেছিলাম এবার আর তিনি থাকবেন না, নিশ্চিত চলে যাবেন। কিন্তু আমাদের সে ধারণা পাল্টে দিলেন তিনি। থেকে গেলেন এদেশেই। তিনি জানান, প্রথমে আসার পর থেকে রুটি ছাড়া আর কিছুই খেতে পারতেন না তিনি। বুঝতেন না কারও ভাষা। এরপর ভাবি ইশারা ইঙ্গিতে বুঝানোর চেষ্টা করতেন। তবে ধীরে ধীরে শেখে ফেলেন বাংলা ভাষা। মানুষের সাথে চলতে চলতে এখন তার ভাষা শুনে বুঝার উপায় নেই তিনি ভিনদেশী। মনে হয় খাঁটি ‘কিশোরগইঞ্জা’। তিনি আরও বলেন, রতন ভাইয়ের মৃত্যুর পর পাঁচটা সন্তান নিয়ে ভাবি যে পরিমাণ কষ্ট করেছেন, এই বিষয়টি জেনে তিন ওয়ার্ডের লোকজন বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন তাকে।
বোসরা পারভীনের দেবর হেদায়েত উল্লাহ বলেন, নির্বাচনে ভাবি প্রার্থী হওয়ার পর থেকে তাকে একনজর দেখতে সব সময় লোকজনের ভিড় লেগেই থাকতো। নির্বাচনী প্রচারণায় বের হলে তাকে দেখার জন্য লোকজন এগিয়ে আসতো। অন্য প্রার্থীরা ডেকে ডেকে যে পরিমাণ লোক জড়ো করতো, ভাবি প্রচারণার বের হলে তাকে একনজর দেখতে, আর তার কথা শোনার জন্য এর চেয়ে দ্বিগুণ লোক জড়ো হতো। আর নির্বাচনের পরে ভাবিকে দেখার জন্য বাড়িতে ভিড় লেগেই রয়েছে। ভাবী মানুষের সাথে মিশতে খুব পছন্দ করেন।
বোসরার প্রতিবেশী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকলে টাকা পয়সা খরচ না করে, কাউকে চা পান আপ্যায়ন না করিয়েও যে জনপ্রতিনিধি হওয়া সম্ভব, বোসরা পারভীনের বিজয়ের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টি প্রমাণিত হলো।
শ্বশুর মো. আবদুল আলী বলেন, আমার বৌমা এদেশে এসে সন্তানদেরকে নিয়ে যে কষ্টে দিনযাপন করেছেন সেটা যারা নিজ চোখে দেখেছে কেবল তারাই বলতে পারবে এই মেয়েটা কতটা সংগ্রামী। আমার ছেলের মৃত্যুর পর জীবনের সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছে সে। এমনকি সন্তানদের মানুষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করেছে সে। সবশেষ নিজেই চায়ের দোকান চালিয়েছে। যেটা করতে এদেশের অনেকেই লজ্জাবোধ করে। তিনি বলেন, আমার পুত্রবধূর এই বিজয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এজন্যে ওয়ার্ডবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
মারিয়া ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডে মাইক প্রতীকে বোসরা পারভীন পেয়েছেন ২৮৩৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বই প্রতীকে আকলিমা খাতুন পেয়েছেন ১৭২০ ভোট। আরেক প্রার্থী মোসাম্মৎ আছিয়া বক প্রতীকে পেয়েছেন ৫০৮ ভোট।
সে হিসেব অনুযায়ী দুই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর মোট ভোটের চেয়ে ৬০৬ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বোসরা পারভীন।